SylhetNews24.com

সারা বিশ্বে উগ্রবাদ জঙ্গিবাদ লেকচার দিয়ে এখন নিজ দেশেই সন্ত্রাসবা

অনলাইন ডেস্ক

সিলেট নিউজ ২৪

প্রকাশিত : ০১:১৬ এএম, ৯ জানুয়ারি ২০২১ শনিবার

যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর ধরে বিশ্বকে গণতন্ত্রের ছবক দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মানবতা, মানবাধিকার, আইনের শাসন আর গণতন্ত্র সুরক্ষার বড় বড় বুলি শুনিয়েছে। 

সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার মুকুট পরে দেশে দেশে আগ্রাসন, সামরিক অভিযান চালিয়ে ঢেলে সাজিয়েছে পুরো সরকার ব্যবস্থা। হুমকি-ধমকি-আলোচনায় কাজ না হলে হামলে পড়েছে অত্যাধুনিক সব যুদ্ধবিমান ও মারণাস্ত্র নিয়ে। 

বিশ্বব্যাপী ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ চালিয়ে আসা সেই যুক্তরাষ্ট্রেই আস্তানা গেড়েছে উগ্রবাদ আর সন্ত্রাসবাদ। এতদিন আড়ালে-আবডালে থাকলেও বুধবার খোদ নিজেদের পার্লামেন্টেই (ক্যাপিটল হিল) সশস্ত্র হামলা ও তাণ্ডবের মধ্য দিয়ে তা প্রকাশ হয়ে গেল গোটা বিশ্বে। আর এর সঙ্গে সঙ্গে ‘বিশ্ব মোড়ল’ ও ‘গণতন্ত্রের প্রহরী’র ভাবমূর্তিও হারাল ‘শান্তির দূত’ যুক্তরাষ্ট্র। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, আজকের পর থেকে আর দেশে দেশে গলা বাড়িয়ে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওকালতি করার মুখ থাকল না দেশটির। কেউ কেউ আবার বলছেন, বিশ্বজুড়ে উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদ লেকচার দেওয়ার ব্যস্ততায় নিজের দেশই সামলে রাখতে পারেনি মার্কিনরা। এখন নিজের ঘরেই সন্ত্রাসবাদ। যুক্তরাষ্ট্রে এই সন্ত্রাস সংস্কৃতিই এবার রপ্তানি হবে বিশ্বে। এনবিসি নিউজ ও রয়টার্স।

এখন থেকে প্রায় দুই দশক আগে ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলা চালায় আল-কায়দা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। এর পরই বিশ্বজুড়ে শুরু হয় মার্কিন বাহিনীর ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ যা আজও শেষ হয়নি। প্রধান টার্গেট মুসলিম দেশগুলো। বৃষ্টির মতো বোমা ফেলছে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো। রণতরী থেকে ছোড়া হচ্ছে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র। 

এভাবে আঘাতের পর আঘাতে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল-ক্লিনিক। হত্যা করছে লাখ লাখ মানুষকে। একটা শেষ হলেই আরেকটা ধরছে। এভাবে বর্তমানে বিশ্বের ৮০টি দেশে যুদ্ধ করছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এবারের টার্গেট ইরান।

কিন্তু এবার আর কোনো বিদেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নয়, মার্কিন কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটল হিলে হামলা চালিয়েছে নিজ দেশেরই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উগ্রবাদী সমর্থকরা। মার্কিন ইতিহাসে নজিরবিহীন এই ঘটনায় বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। 

তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিশ্বনেতারা বলেছেন, সারা বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বুলি আওড়ানো ট্রাম্প নিজ দেশের গণতন্ত্রকেই ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছেন। ট্রাম্প সমর্থকদের চালানো তাণ্ডবকে ‘ভয়াবহ’ ও ‘গণতন্ত্রের ওপর নজিরবিহীন আঘাত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন কয়েকজন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টসহ অনেক নেতাই। কিন্তু এর প্রেক্ষাপট এক দিনে তৈরি হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে চার বছর আগে রিপাবলিকান সরকারের আগমনে ক্রমান্বয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হতে থাকে।

ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়ে একের পর এক বিতর্কিতবিষয়কে সামনে এনে দিকভ্রান্ত, বর্ণবাদী, আদর্শহীন অযোগ্য রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেই বিশ্ববাসীর সামনে প্রতিভাত হয়েছেন। ক্ষমতার অন্ধে মাতোয়ারা এই বিলিওনিয়ার প্রেসিডেন্ট, ব্যবসা-বাণিজ্যে সফল হলেও রাষ্ট্র পরিচালনা তথা বিশ্ব নেতৃত্বে কতটা অযোগ্য তার লক্ষণগুলো আরও দুবছর আগে থেকেই সুস্পষ্ট হতে থাকলেও বিগত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে তা পুরোপুরি বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়।


নির্বাচনে কারচুপির সম্ভাবনাকে সামনে এনে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকার লক্ষ্যে দিশাহীন হয়ে পড়েন, করোনাকালে নিজ দেশের সরকার আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষিত বিধিনিষেধ অমান্য করে আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গোঁয়ার্তুমির রাজা হিসাবেই নিজেকে তুলে ধরেছেন, তবুও আশ্চর্যজনকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটের ইতিহাসে রেকর্ডতম প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বর্ণবাদ, মানবাধিকারের লঙ্ঘন, উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদের উত্থান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু ট্রাম্প অত্যন্ত সচেতনভাবেই এর সব কয়টি ধারণ করেছিলেন বলেই রেকর্ড পরিমাণ জনপ্রিয়তায় প্রতিটি রাজ্যেই শক্তিশালী প্রতিযোগিতা গড়ে তুলতে সক্ষম হন। নির্বাচনে হেরেও সক্ষম হন ক্যাপিটাল হিলের সামনে নজিরবিহীন গণজমায়েত করে আক্রমণাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। 

দুঃখজনকভাবে আহত-নিহতের মধ্য দিয়ে এর সাময়িক পরিসমাপ্তি ঘটলেও পৃথিবীর ইতিহাসে ১৮১৪ সালের পর ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলের এই সংঘবদ্ধ আক্রমণ একদিকে যেমন কলঙ্কজনক ইতিহাস হয়ে থাকবে অন্যদিকে বর্ণবাদীদের এই সাময়িক ব্যর্থতা ভবিষ্যতে তাদের আরও সংঘটিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করলেও অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।