SylhetNews24.com

ছোট হয়ে আসছে বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির বাজার

অনলাইন ডেস্ক

সিলেট নিউজ ২৪

প্রকাশিত : ১২:৫২ এএম, ১ নভেম্বর ২০১৯ শুক্রবার

বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির বাজারে অশনি সংকেত। নতুন শ্রমবাজার তো খুলছেই না, বরং পুরনো শ্রমবাজারের দরজাতেও নেতিবাচক আভাস কড়া নাড়ছে। আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরাক, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, লেবাননসহ আরও কয়েকটি দেশে জনশক্তির বাজার এখন বন্ধ বললেই চলে।

আর ওমান, কাতার, জর্ডানের মতো শ্রমবাজার এখন হাত ছাড়া হওয়ার উপক্রম। এই অবস্থায় জনশক্তি পাঠানোর চাপ এখন সৌদি আরব, ওমান ও কাতারে। লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে অনেকেই সেখানে যাচ্ছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হয়ে খালি হাতে দেশে ফিরে আসছে। জনশক্তি বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে  করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভিসা জটিলতা ও কূটনৈতিক ব্যর্থতাসহ নানা কারণে শ্রমবাজার ছোট হয়ে আসছে।

 

সৌদি আরবে এখন বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়ার বদলে পাকিস্তান থেকে শ্রমিক নেওয়ার কোটা বাড়ানো হয়েছে। আর জনশক্তি রফতানিকারক সংগঠন এখন প্রায়শই দলাদলিতে ব্যস্ত। যে কারণে জনশক্তি রফতানি পরিস্থিতি উন্নয়নে তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।

 

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ৯ মাসে সৌদি আরব থেকে ফিরে এসেছে প্রায় ১৬ হাজার প্রবাসী নারী গৃহকর্মীও পুরুষ কর্মী। বৈধ কাগজ থাকা সত্তে¡ও কয়েক দিনে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে ফেরত এসেছেন ৩৬০ জন। এদের মধ্যে শুক্রবার ২০০ জন ও পরদিন অর্থাৎ শনিবার ১৬০ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সিরাজগঞ্জের মো. শহীদুল ইসলাম চলতি বছরের জানুয়ারিতে জেদ্দায় একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মী হিসেবে নিয়োগপত্র নিয়ে গিয়েছিলেন। এখনও তার ভিসার মেয়াদ রয়েছে আরও তিন মাস। তিনি জানান, আমি র্মাকেটে গিয়েছিলাম । ষেখান থেকে বের হওয়ার পরই পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে। সাত দিন জেলে থাকার পর দেশে পাঠিয়েছে।

 

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক বলছে, ২০১৯ সালে সৌদি আরব থেকে ১৮ হাজার শ্রমিক দেশে ফিরেছেন। এদের মধ্যে ১ হাজারের বেশি নারী শ্রমিক। অন্যদিকে, সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ জানিয়েছেন, যাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে তারা যেসব কোম্পানিতে কাজ করতেন সেসব প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দূতাবাসকে জানিয়েছে, এদের অনেকেই আকামার আইন ভেঙেছেন। অর্থাৎ এক প্রতিষ্ঠানের কাজের সম্মতিপত্র নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। আবার কেউ নিয়োগ পাওয়া প্রতিষ্ঠান থেকে পালিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন।

 

এ পরিস্থিতির জন্য জনশক্তি রফতানিকারকরা দায়ী। সৌদিতে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। তারা মনে করে, আমাদের দেশের লোকজন অবৈধভাবে কাজ করেন। তবে এটাও ঠিক, দালাদের প্রতারণায় সৌদি কারাগারে অসংখ্য বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছে। বাংলাদেশ ও সৌদি আরবে আকামা বিক্রির চক্র রয়েছে। তাদের কারণেই সৌদি আরবে বিপাকে পড়ছেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা।

 

সৌদি আরব থেকে গত শনিবার ফেরত আসা নড়াইলের নয়ন ও শুক্কর মোল্লা জানান, তারা মাত্র দুই মাস আগে সৌদিতে গেছেন রঙ মিস্ত্রির কাজ নিয়ে । কিন্তু তারাও জানে না কেন তাদের খালি হাতে ফিরতে হলো। রিয়াদে একটি পেট্রোল পাম্পে তিন মাস চাকরি করার পর আরও বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেন ফুয়াদ। আকামার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও থেকে যান তিনি। নতুন করে আকামা বা কাজের অনুমতি নিতে অনেক টাকা লাগে বলে তিনি আর আকামা নেননি। কিছুদিন আগে তিনি দেশে ফিরে আসেন। তবে তিনি কিছুদিন পুলিশের হাতে আটক হয়ে সৌদি কারাগারে ছিলেন। তার অভিযোগ এখন সৌদি পুলিশ ধরে ধরে দেশে পাঠাচ্ছে। এমনকি যাদের আকামা আছে তাদেরও।

 

তবে সৌদি আরবে চাকরি করেন এমন একজন এই প্রতিনিধিকে জানান, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। অর্থনৈতিক মন্দাসহ নানা কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভুগতে হচ্ছে। যেসব কর্মী মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় চাকরি করছে, তাদের কাজ না থাকা, ফ্রি ভিসার নামে প্রতারণা, আকামা না দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

 

জানা গেছে, চলতি বছর এ পর্যন্ত ৩৫ হাজার প্রবাসী বিদেশ থেকে ফেরত এসেছেন। তাদের মধ্যে ২৫ হাজার এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি দেশ থেকে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সৌদি আরব ও মালয়েশিয়াতে ৫ লাখের বেশি শ্রমিক অবৈধ হয়ে অমানবিক জীবনযাপন করছে। সর্ববৃহৎ শ্রমবাজার সৌদি আরবে এখন চলছে ব্যাপক পুলিশি ধরপাকড়। এই পরিস্থিতিতে বায়রার সাবেক সভাপতি গোলাম মুস্তাফা জানান, সৌদিতে পুলিশি হয়রানি বন্ধ করার ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ আকামাধারী কর্মীদের আইনি সহায়তা দেওয়া একান্ত প্রয়োজন।

 

এদিকে, বেকারত্ব ও ধীরগতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরব বিশ্বের দেশগুলোয় সামাজিক অস্থিরতা তৈরিতে সহায়ক ভ‚মিকা পালন করছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। তবে রাজকীয় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালামের ঘোষিত ভিশন-২০৩০ কর্মসূচির অধীনে শ্রমবাজার শতভাগ স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে নির্ধারণ করেছে সৌদি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি জ্বালানি খাতের ওপর অর্থনীতির নির্ভরশীলতা কমানোরও উদ্যোগ নিয়েছে। সৌদি অর্থনীতির এই পালাবদলে চোরাবালিতে আটকা পড়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

 

অনেক দিন ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে জনশক্তি রফতানি বন্ধ রয়েছে। দেশটিতে হাতে গোনা কিছু মহিলা গৃহকর্মী যাচ্ছে। কুয়েতেও জনশক্তি রফতানি ক্রমশ কমে যাচ্ছে। ২০১৭ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বাহরাইনে কর্মী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। ২০১৮ সালে সেপ্টেম্বর থকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে। কাতারেও কর্মীর সংখ্যা কমছে।

 

এ ব্যাপারে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, আগামী ৬ নভেম্বর মন্ত্রী ইমরান আহমেদ মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন। সেখানে দেশটির মানবসম্পদমন্ত্রীর সঙ্গে জনশক্তি রফতানি নিয়ে আলোচনা হবে। এই আলোচনায় অনেকটা ফলপ্রসূ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

এ ছাড়াও মন্ত্রণালয় এখন ইউরোপসহ অন্য বাজার সম্প্রসারণ করার ব্যাপারে কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে জাপানসহ আরও কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাটাগরি জনশক্তি নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে শ্রমবাজারের ধরন পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। এখন সেই আগের মতো জনশক্তির চাহিদা কমে যাচ্ছে। তবে জনশক্তি রফতানিতে কোনো ধরনের অশনি সংকেত নেই। তাই যদি হতো তা হলে দেশে তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ বৃদ্ধি পেত না।-সময়ের আলো।