ঢাকা, ২২ নভেম্বর, ২০১৯
SylhetNews24.com
শিরোনাম:
২৫ জনকে আসামি করে আবরার হত্যার চার্জশিট:অভিযুক্তরা উচ্ছৃঙ্খল ছিল

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়: সিলেটের তারাপুর চা বাগান ও মেডিকেল কলেজ ছাড়তে হবে রাগীব আলীকে

প্রকাশিত: ৫ মার্চ ২০১৬   আপডেট: ৭ মার্চ ২০১৬

তারাপুর থেকে তালিবপুর এর ব্যবধান প্রায় ১০ কিলোমিটার। এ দুটি স্থান নিয়ে একাধিক মামলায় বারবার আলোচনায় আসছেন সিলেটের দানবীর হিসেবে পরিচিত শিল্পপতি রাগীব আলী।

তালিবপুরের অংশ বিশেষকে ‘রাগীবনগর’ করার মামলায় হারার পর এবার তিনি সিলেট নগরীর পাঠানটুলা এলাকায় তারাপুর চা বাগান মামলায় সর্বোচ্চ আদালতে হারলেন। তার ছেলে আবদুল হাইর রিটের শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন।

রায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী তাকে ৬ মাসের মধ্যে তারাপুর চা বাগানের দেবোত্তর সম্পত্তিতে নির্মিত রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থাপনা সরিয়ে নিতে হবে। সেখানে আবার স্থাপন করতে হবে চা বাগান।

সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৩০ লাখ ৭৬ হাজার ১৮৯ টাকা ২০ পয়সা এবং ওই বাগান থেকে চা রফতানি বাবদ আয়ের ৫ কোটি টাকা সেবায়েতের কাছে ফেরতও দিতে হবে। এমনকি রায়ে দেবোত্তর সম্পত্তি ইজারা অবৈধ, রিটকারীর সকল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ, বাগানের খালি জায়গায় দেবি স্থাপনের কাজ এক মাসের মধ্যে শেষ করাসহ ১৭ নির্দেশনা দেন আদালত।

আদালতের রায়ের বিষয়টি জানাজানির পর দু`দিন ধরে সিলেটে আলোচনার ঝড় ওঠে। ২০০৯ সালে রাগীব আলীর ছেলে আবদুল হাইয়ের দায়েরকৃত সিভিল মামলার শুনানি হয় গত ১২ ও ১৯ জানুয়ারি।

শুনানি শেষে ১৯ জানুয়ারি আপিল বিভাগের প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ বহুল আলোচিত এ আপিলের রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে বলা হয়েছে, তারাপুর চা বাগান দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে কোনোভাবে সেবায়েত বা তার মনোনীত ব্যক্তি স্থানান্তরিত করতে পারবে না। অভিযুক্ত সেবায়েত কর্তৃক ৯৯ বছরের জন্য তারাপুর চা বাগানকে স্থানান্তর বা লিজ প্রদান করা সম্পূর্ণ আইনবিরোধী। প্রতিষ্ঠান কর্তৃক (ট্রাস্টের) স্থাপিত দেবির মূর্তি নির্দিষ্ট স্থানেই থাকবে।

রিট আবেদনকারী আবদুল হাই ও রাগীব আলীকে তারাপুর চা বাগানের খালি জায়গায় দেবি মোতায়েনের কাজ এক মাসের মধ্যে শেষ করতে আদেশে বলা হয়। রায়ে আরও বলা হয়েছে, তারাপুর চা বাগানে নির্মিত সব অবকাঠামো ৬ (ছয়) মাসের মধ্যে অপসারণ করে সে জায়গায় চা বাগান করতে হবে। ব্যর্থ হলে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের সহায়তা নিয়ে অপসারণ করা হবে। এ বাবদে ব্যয়িত অর্থ জেলা প্রশাসক রিট আবেদনকারীদের কাছ থেকে গ্রহণ করবেন।

রায়ে সেবায়েতের অনুপস্থিতিতে সিলেট শহরের ১০ নেতৃস্থানীয় সেবায়েত বা পুরোহিতের পরামর্শক্রমে সেবায়েত নিয়োগ দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

রিট আবেদনের ১০নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত চা রফতানি বাবদ আয়ের ৫ কোটি টাকা সেবায়েতের কাছে ফেরত দানের নির্দেশ দেওয়া হয়। রায়ে সিলেটের জেলা প্রশাসককেও কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, জেলা প্রশাসক আপিল বিভাগে প্রদত্ত রায়ের আদেশগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে কি-না তা পর্যবেক্ষণ করবেন। রিট আবেদনকারীরা আদেশ না মানলে তিনি আইনগত ব্যবস্থা নেবেন। উপযুক্ত জায়গায় মেডিকেল কলেজটিকে স্থানান্তর করবেন। রিট আবেদনকারীদের সমস্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করবেন এবং মেডিকেল কলেজের জন্য সাময়িক লিজ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনে এসব জব্দকৃত অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা উত্তোলন করতে পারবেন।

রিট আবেদনকারীরা চা বাগান পুনঃস্থাপনে ব্যর্থ হলে জেলা প্রশাসক একটি কমিটি গঠন করে এ কাজটি সম্পন্ন করবেন। এ বাবদ যে অর্থ ব্যয় হবে তা তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি থেকে আদায় করবেন। একই সঙ্গে কোতোয়ালি থানার ১১৭নম্বর মামলাটি চালু করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয় ২০০৫ সালে মামলাটি জালিয়াতির অভিযোগে করা হয়েছিল।

সূত্র মতে, শহরতলির তারাপুর চা বাগানের মালিক ছিলেন সিকে হারাধন। তার মৃত্যুর পর তারাপুর চা বাগানসহ তার সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি স্থানান্তর করা হয় বৈকুণ্ঠ চন্দ্র গুপ্তের নামে। পরে তিনি শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ জিউর দেবতার নামে রেজিস্ট্রি দানপত্র করে দেন। ১৯৬৮ সাল থেকেই এ সম্পত্তি দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। বৈকুণ্ঠ চন্দ্র গুপ্তের মৃত্যুর পর রাজেন্দ্রলাল গুপ্ত সম্পত্তির সেবায়েত নিযুক্ত হন। রাজেন্দ্র গুপ্ত মারা গেলে তার ছেলে ডা. পঙ্কজ কুমার গুপ্ত সেবায়েতের দায়িত্ব পান।

পঙ্কজ কুমার গুপ্ত ভারত চলে গেলে কথিত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি মূলে দেবোত্তর সম্পত্তিটির সেবায়েত বনে যান রাগীব আলীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় দেওয়ান মোস্তাক মজিদ। ১৯৮৯ সালে মোস্তাক মজিদই রাগীব আলীর ছেলে আবদুল হাইকে ৯৯ বছরের লিজ প্রদান করেন।

এ জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সহকারী সচিব মির্জা ফজলুল করিমের স্বাক্ষর জাল করে চিঠিও (স্মারক নং ভূঃ মঃ/শা-৮/খাজব ৫৩/৮৯) দেখানো হয়। চা বাগান উদ্ধারে গঠিত সংসদীয় তদন্ত কমিটি সে সময় তারাপুর চা বাগান আত্মসাতের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের সুপারিশ করে।

প্রতারণার মাধ্যমে ভূ-সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রাগীব আলীর বিরুদ্ধে তৎকালীন সিলেট সদর ভূমি কমিশনার এসএম আবদুল কাদের কোতোয়ালি থানায় মামলাটি করেন। মামলায় ৮০০ কোটি টাকার দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের অভিযোগ করা হয় রাগীব আলীর বিরুদ্ধে।

২০০৮ সালে সিলেট দুদকের উপপরিচালক আরকে মজুমদার বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় আরেকটি মামলা করেন। সব মামলা হাইকোর্টে স্থগিত হয়ে যায়। পাশাপাশি সরকারকে রুলনিশি জারি করেন আদালত। সরকার রুলের জবাবও দেয়। উচ্চ আদালতের রায় রাগীব আলীর বিপক্ষে গেলে ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করেন আবদুল হাই।

তারাপুর মামলায় হারার আগে তালিবপুরের নাম পাল্টে `রাগীবনগর` করার চেষ্টা মামলায়ও তার বিপক্ষে রায় হয়। ৪ বছর পর শুনানি শেষে গত ৩১ আগস্ট `রাগীবনগর` ব্যবহার অবৈধ বলে রায় দেন বিচারক লায়লা মেহেরবানু।

সিলেটের দক্ষিণ সুরমার কামালবাজার এলাকার তালিবপুর নভাগের বাসিন্দা রাগীব আলী নিজের নামে গ্রামের নামকরণ করতে চেয়েছিলেন। বর্তমানে ওই রায়ের বিরুদ্ধে জজ আদালতে আপিল করেছেন তিনি। রাগীব আলী সমকালকে বলেন, ৬ মাসের মধ্যে স্থাপনা সরানো কীভাবে সম্ভব। এ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করা হবে। তিনি রায়ের নকল কপি হাতে না পেলে বিস্তারিত বলতে পারবেন না বলে জানান।

আরও পড়ুন
মুক্তিযুদ্ধ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত