ঢাকা, ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৯
SylhetNews24.com
শিরোনাম:
২৫ জনকে আসামি করে আবরার হত্যার চার্জশিট:অভিযুক্তরা উচ্ছৃঙ্খল ছিল

ছাত্রলীগের ভাংচুর-আগুন: ঢাবিতে বৈশাখী কনসার্ট বাতিল

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ এপ্রিল ২০১৯  

ছাত্রলীগের একাংশের দু'দফা ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের পর নিরাপত্তাহীনতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চৈত্রসংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজিত কনসার্ট বাতিল করা হয়েছে। সরিয়ে নেওয়া হয়েছে মঞ্চ। 

শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বর থেকে কনসার্টের সব আয়োজন গুটিয়ে নিয়ে যায় পৃষ্ঠপোষকরা। তারা দাবি করেছেন, ভাংচুর ও আগুনে তাদের প্রায় এক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, শুক্রবার রাত ১টার দিকে ছাত্রলীগের একাংশের নেতাকর্মীরা এসে কনসার্ট মঞ্চ ও অন্যান্য উপকরণ ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। এ নিয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়। এতে সাগর নামে স্যার এ এফ রহমান হল ছাত্রলীগের এক কর্মী আহত হন। এই বিরোধের জের ধরে গতকাল সকাল ৮টার দিকে দুটি মোটরসাইকেলে চারজন এসে কনসার্টের সাউন্ড সিস্টেমে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। দুই দফার হামলা ও ভাংচুরে নিরাপত্তাহীনতায় কনসার্ট বাতিল করেছেন আয়োজকরা।

সরেজমিন দেখা যায়, মল চত্বরের সীমানাপ্রাচীর ও আশপাশে থাকা কনসার্টের ব্যানার-ফেস্টুন সব ছেঁড়া, কোনোটি আগুনে পোড়া। কনসার্টের মূল মঞ্চ এলোমেলো, পাশে মেলার স্টলগুলোর স্টিলের কাঠামোর তাঁবুও উল্টে আছে। এর পাশে কাঠ ও বাঁশে আগুন লাগানো হয়েছে। পড়ে আছে বেশ কয়েকটি ভাঙা ফ্রিজ।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আতিকুর রহমান খান, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আল আমিন রহমান, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইউসুফ উদ্দীন খান, কবি জসীমউদ্‌দীন হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আরিফ হোসেন, অমর একুশে হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি এহসান উল্লাহ, হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সানী ও স্যার এ এফ রহমান হলের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান তুষারের নেতৃত্বে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। তারা সবাই ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের অনুসারী।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বৈশাখী কনসার্টের এই আয়োজন সম্পর্কে ছাত্রলীগ সভাপতি শোভনকে কিছু জানানো হয়নি। অন্য তিন নেতা সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, ঢাবি সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইনের নেতৃত্বে এ কনসার্ট আয়োজন করা হয়। এতে শোভনের অনুসারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটান। একে কেন্দ্র করে বিভিন্ন হল থেকে নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে যান। ক্যাম্পাসে উত্তপ্ত পরিবেশ বিরাজ করছে।

সূত্র জানায়, কনসার্টের পৃষ্ঠপোষক কোমল পানীয়ের ব্র্যান্ড 'মোজো'। তারা অনুষ্ঠানের জন্য ২০ লাখ টাকা দিয়েছে। মূলত এই টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়েই দ্বন্দ্বের সৃষ্টি। ছাত্রলীগের একটি সূত্র জানায়, ছাত্রলীগ সভাপতি শোভনকে 'কোণঠাসা' করতেই অন্য তিন নেতা একজোট হয়ে এসব করছেন। অন্য একটি অংশ বলছে, অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের আগে শোভনের বাসায় একটি সভা হয়। সেই সভার নির্দেশ অনুযায়ীই তার অনুসারীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন।

এ বিষয়ে ডাকসুর জিএস ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাব্বানী বলেন, যারাই এ কাজ করেছেন, তাদের শাস্তি পেতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাদের বহিস্কারের বিষয়ে প্রশাসনকে অনুরোধ করা হবে।

ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত অভিযোগ করেন, মল চত্বরে যারা ছিলেন তাদের সবাই দেখেছেন কেন্দ্রীয় সভাপতি শোভনের কর্মীরা ওই কাজ করছেন। তার (শোভন) নির্দেশেই এটা করা হয়েছে। তিনি বলেন, যারা পহেলা বৈশাখের কনসার্টে বাধা দেয়, তারা অন্তত স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হতে পারে না। এর সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিচার দাবি করেন তিনি।

ডাকসুর এজিএস ও ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতত ১৩ ও ১৪ এপ্রিলের অনুষ্ঠান যেন সুন্দরভাবে হয়, সেজন্য আমরা কাজ করব।

তবে অনুসারীদের হামলার বিষয়টি অস্বীকার করেন ছাত্রলীগ সভাপতি শোভন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি ঘটনার পর জানতে পেরেছি। এটাকে রাজনৈতিক ইস্যু বানানো হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটির সঙ্গে কেন্দ্রের তো একটি সমস্যা আগে থেকেই আছে। অন্যদিকে, ডাকসুর সঙ্গে যুক্ত ছাত্রলীগ আমাকে রাজনীতি থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা করছে। ডাকসু ও ছাত্রলীগের মনোমালিন্যের কারণে বিষয়টা রাজনৈতিক ইস্যু বানানো হচ্ছে।

ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর কনসার্ট বাতিল ও নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেন কোমল পানীয় প্রতিষ্ঠান 'মোজো'র অপরেশন ব্র্যান্ড হেড মার্কেটিং বিভাগের প্রধান আজম বিন তারেক। তিনি বলেন, মধ্যরাতে প্রথম অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর আমাকে অনেক অনুরোধ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে সবকিছু 'আন্ডার কন্ট্রোলে' থাকবে। তাই আমি সবকিছু গুছিয়ে পুনরায় কাজ করা শুরু করেছিলাম। সকাল ৮টার দিকে চারজন হেলমেট পরা লোক এসে ৪৩ লাখ টাকা মূল্যের সাউন্ড সিস্টেমে আগুন দেয়। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের প্রায় এক কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। এ অবস্থায় এখানে থাকা আর সম্ভব নয়।

এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে ডাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক আসিফ তালুকদার বলেন, আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলাম সবাইকে একটা সুন্দর কনসার্ট উপহার দেওয়ার জন্য। তবে যা ঘটে গেছে, তা প্রকাশের ভাষা নেই।

কনসার্ট বাতিল প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক গোলাম রব্বানী বলেন, এটা শিক্ষার্থীদের প্রোগ্রাম, তারাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। আর কারা আগুন দিয়েছে, এটা আমরা দেখছি। সহকারী প্রক্টর আবদুর রহিম সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান।

শোভনের অনুসারীর কক্ষে ভাংচুর: শুক্রবার রাতে মল চত্বরের ঘটনার পর ছাত্রলীগ সভাপতি শোভনের অনুসারী স্যার এএফ রহমান হলের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান তুষারের ৪০৯ নম্বর কক্ষে ভাংচুর করা হয়। সাদ্দাম হোসাইনের অনুসারীরা এটি করেছেন বলে অভিযোগ করেন তুষার। এ ছাড়া মল চত্বরে ভাংচুর চলাকালীন মারধরের শিকার হন ঢাবি ছাত্রলীগের সাবেক নেতা সাগর রহমান। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাদ্দাম হোসাইন।

পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান ডাকসুর নয়- নুরুল: কনসার্ট উপলক্ষে ছাপানো পোস্টারে ছাত্রলীগের সঙ্গে ডাকসুর নামও আয়োজক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এর আয়োজক ডাকসু নয় বলে দাবি করেছেন ভিপি নুরুল হক নুর। তিনি বলেন, এটা ছাত্রলীগের অনুষ্ঠান। ডাকসুর হলে আমি জানতাম। এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না।

এ বিষয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাসে নুর বলেছেন, 'নিজেরা কোটি টাকার স্পন্সরের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে মারামারি, ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ করেছেন। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে কোণঠাসা করতে প্রচার চালাচ্ছে এটি ডাকসু ও ছাত্রলীগের প্রোগ্রাম। অথচ ডাকসুতে এই প্রোগ্রাম নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। দয়া করে নিজেদের ধান্ধাবাজি, চাঁদাবাজিতে ডাকসুর নাম জড়িয়ে ডাকসুকে কলঙ্কিত করবেন না। ডাকসুর সঙ্গে এই বাণিজ্যিক কনসার্টের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই।'

তবে অনুষ্ঠানের বিষয়ে ভিপি নুরুল অবগত আছেন বলে দাবি করেন ডাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক আসিফ।

আরও পড়ুন
সাহিত্য-সংস্কৃতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত