ঢাকা, ২৩ জানুয়ারি, ২০২১
SylhetNews24.com
শিরোনাম:
করোনার টিকা পেলেই সম্মুখসারির যোদ্ধাদের অগ্রাধিকার: প্রধানমন্ত্রী অনেকদূর এগিয়েছি সত্য,তবে যেতে হবে আরও বহুদূর:প্রধানমন্ত্রী সত্য বলায় হয়তো আমার চাকরিও থাকবে না:ওবায়দুল কাদেরের ভাই ভ্যাকসিন কবে আসবে সেটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না: ভারতীয় হাইকমিশন টিকা নিয়ে সরকার ‘তেলেসমাতি’ খেলা শুরু করেছে:রিজভী ২৮ জন সিলেটিসহ মাত্র ৩৪ যাত্রী নিয়ে লন্ডন থেকে আসলো বিমান

কালেরসাক্ষী স্হাপত্য শিল্পের পাইলগাও জমিদার বাড়ী সংরক্ষণের উদ্যোগ

হুমায়ূন রশিদ চৌধূরী

প্রকাশিত: ২৩ নভেম্বর ২০২০  

সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুরের পাইলগাঁও জমিদার বাড়ী এখন কালের সাক্ষি । সাড়ে পাঁচ একর জায়গা বেষ্টিত ভূমিতে তৈরী করা হয় এই বাড়ী। কালের পরিক্রমায় বিবর্ন বিশাল এই জমিদারবাড়ীটি আজো সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের ধারক। 

ভূমি খেঁকোদের লুলুপ দৃষ্টির মধ্যে তিন শতাধিক বছরের অধিককালে স্মৃতি বিজড়িত এই জমিদারবাড়ির অবকাঠামো মুগ্ধতা ছড়ায় ভ্রমণ প্রেমীদের। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বাহক এই বাড়িটি এখনো পুরাকীর্তি হিসাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

তবে সুনামগঞ্জ-৩ আসনের (জগন্নাথপুর-দক্ষিণ সুনামগঞ্জ) সংসদ সদস্য ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, বর্তমান সরকার ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণের  ব্যাপারে খুবই আন্তরিক। পাইলগাঁও জমিদার বাড়ী সংরক্ষণে নিশ্চয়ই আমরা উদ্যোগ নেব।এটা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ।

বাড়ীর সামনে বিশাল “মাধব রামের তালাব” হিসেবে পরিচিত দিঘিতে হালকা ঢেউ চাঁদনী রাতে মোহনীয় পরিবেশের সৃষ্টি করে। পর্যটন সমৃদ্ধ ও প্রাচীন স্থাপনার কারুকার্য সমৃদ্ধ নির্মাণশৈলী চোঁখ জুড়ায়। 

বাড়ীটিতে শেওলা বাসা বেধেছে। ভিতরবাড়ীর একটি ঘরের ইটের টালি  যখন তখন খসে খসে পড়ছে। ঝোপ জঙ্গলে পরিণত হয়েছে মন্দির ঘর। পোকামাকড়, সাপ বিচ্ছুর চলাফেরা মধ্যেও  ‘প্রত্নতাত্তিক নিদর্শনার্থীরা ছুটে আসেন,’ এই মন্তব্য করে জগন্নাথপুর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান বলেন, ‘পাইলগাঁও জমিদার বাড়িটি স্থাপত্যশিল্পের অপূর্ব নিদর্শন।  প্রশাসন ৬৩ শতাংশ বেদখল ভূমি উদ্ধার করেছে। ঐতিহ্য সংরক্ষনের চেষ্টা চলছে।’ 

সম্পতি উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে পুলিশ ভূমি খেঁকোদের দেয়াল ভেঙে জমিদার বাড়ির ৬৩ শতাংশ জায়গা দখলমুক্ত করেছে। 

পাইলগাঁও ইউনিয়নের পাইলগাঁও গ্রামের তৎকালীন জমিদার ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর বংশধরগণ ভারতে চলে গেলে বাড়ির জায়গা-জমি দখলে করে নেয় এলাকার ভূমিখেঁকো চক্র। এলাকাবাসীর দাবীর প্রেক্ষিতে প্রশাসন দখল উচ্ছেদে করে জমি উদ্ধার করে। বাড়িটির জমি উদ্ধারের খবরে এলাকাবাসী ও জমিদার বজেন্দ্র নারায়ন চৌধুরীর উত্তরাধিকারগণ আনন্দিত হয়েছেন।

কলকতায় বসবাসকারী বজেন্দ্র নারায়ন চৌধূরীর মেয়ের দিকের নাতনী অধ্যাপিকা ভাশতী চক্রবর্তী মোবাইল ফোনে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘যেহেতু জমিদার বজেন্দ্র নারায়ন চৌধূরীর শিক্ষার প্রতি অনুরাগ ছিল, তাই তার বাড়ীটিতে নারীশিক্ষার অগ্রগতির জন্য কোন প্রতিষ্টান স্থাপিত হলে,তার আত্মার শান্তি হবে।’ তিনি তার পরিবারের পক্ষ থেকে ভূমি উদ্ধারের জন্য প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির প্রতি কৃতঞ্জতা প্রকাশ করেছেন। 

২০২০ সালের  ২৫ জানুয়ারী জগন্নাথপুর ব্রজেন্দ্রনাথ চৌধূরী হাই স্কুলের শতবর্ষ উদযাপন হয় অত্যন্ত জাকজমকপূর্ণ ভাবে।  অনুষ্টানে ব্রজেন্দ্রনাথের স্বজনরা ভারত সহ বিভিন্ন  স্থান থেকে অংশ নেন। অনুষ্টানে প্রধান অতিথি ছিলেন পারিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান এমপি। প্রসঙ্গত: তৎকালীন সময়ে জগন্নাথপুরে  ব্রজেন্দ্রনাথ হাই স্কুল, সিলেট নগরীরতে রসময় হাই স্কুল ও সিলেট মহিলা কলেজ (পরে যা সরকারী মহিলা কলেজে উন্নীত হয়) স্থাপন করেন।

শতবছরের ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথপুরের ব্রজেন্দ্রনাথ হাই স্কুলে ছাত্র ছিলেন, জাতীয় নেতা, দেশের প্রথম পররাষ্ট্র মন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ, রেল মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, বর্তমান পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএম মান্নান, অর্থনীতিবিদ ড. আখলাকুর রহমান, জগন্নাথপুর এডুকেশন ট্রাষ্টের সেক্রেটারী ও লন্ডন-বাংলা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্টাতা সভাপতি সাংবাদিক মুহিব চৌধূরী সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ। 

মুহিব চৌধূরী বলেন, ‘বাড়ীটি ঐতিহ্যের অংশ। এটি সম্পূর্ণ দখলদার মুক্ত হয়ে শিক্ষার উন্নয়নে কাজে লাগলে মানুষ উপকৃত হবে।’   

উল্লেখ্য, বজেন্দ্রনারায়ণ চৌধূরীর জন্ম ১৮৮২ সালে। স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষ মূহূর্ত পর্যন্ত তিনি দেশেই ছিলেন। ৭২ সালে তিনি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ১৯০৫ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সিয়েল কলেজ থেকে ইতিহাস ও অর্থনীতিতে এমএ পাশ করে স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯০৬ সালে তিনি আইনে ডিগ্রী লাভ করে ১৯০৭ সালে সিলেট কোর্টে প্রেক্টিস করেন। তার বাসভবনকে মহিলা কলেজ রূপান্তরিত করার পর দুবছর অনারারী অধ্যক্ষের দয়িত্ব পালন করেন। 

জগন্নাথপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি ইয়াসির আরাফাত জানান, পাইলগাঁও জমিদার বাড়ি উপজেলার একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। এটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত বছর ৭ নভেম্বর প্রত্নতত্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নিকট এই বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য লিখিত আবেদন করা হয়।

পুরাকীর্তি হিসেবে গেজেট ঘোষণার লক্ষ্যে যাবতীয় তথ্যও নেওয়া হয়েছে। শ্রীঘ্রই পাইলগাঁও জমিদার বাড়িটি অধিদপ্তর সংরক্ষণ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

সরজমিনে দেখা যায়, তিনশত বছরের পুরনো জমিদারবাড়িটি এই অঞ্চলের গৌরবময় ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। ভিথরবাড়ীর পুকুর ঘাটটি অনেক সুন্দর। ক্ষয়িষ্নু কাচারী ঘরের সমানের বিশাল ঘরটির সামনে সানবাঁধা ঘাটটি যত্নের অভাবে নষ্ট হয়েছে। তবুও গ্রামের মানুষ নিশ্চিন্তে সাঁতার কেটে তৃপ্ত হয়।

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার  ইউনিয়নে পাইলগাঁও জমিদারবাড়ি অবস্থিত।  সুবিশাল জমিদারবাড়ির দক্ষিণে কুশিয়ারা নদীর তীর থেকে কারুকাজ খচিত নকশায়  নান্দনিকতার অবলোকন করা যায়। বড় ঘরের ছাদে বিশাল লোহার পাত যা প্রাচীন পুরাকীর্তির নিদর্শন। পাইলগাঁও জমিদার পরিবারের শেষ জমিদার ছিলেন ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ। তিনি সিলেট বিভাগের কংগ্রেস সভাপতি এবং আসাম আইন পরিষদের সদস্য ছিলেন। 

পাইলগাঁও জমিদারদের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ।  পাইলগাও সহ সমগ্র সিলেট বিভাগের শিক্ষা, সাহিত্য, রাজনীতি ও সমাজসেবায় ব্রজেন্দ্র নারায়নের অনন্য অবদান রয়েছে। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সেই খ্যাতনামা পুরুষদের চারণভূমি আজ প্রায় বিলীন হওয়ার পথে। তবে আশার কথা, দেরীতে হলেও ঐতিহাসক এই স্থাপনাটি সংরক্ষনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। 
 

আরও পড়ুন
ঐতিহ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত