ঢাকা, ২৬ আগস্ট, ২০১৯
SylhetNews24.com
শিরোনাম:
ব্রেকিং নিউজ--বরগুনায় রিফাত হত্যা মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড র‍্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত

আমাদের আবু তৈয়ব স্যার

সৈয়দ সেলিম মো. আব্দুল কাদির (সেলিম সৈয়দ)

প্রকাশিত: ৫ মার্চ ২০১৭  

সিলেট সরকারি কলেজ ১৯৮৩-১৯৮৫ সেশনে  ইন্টার মিডিয়েট এর ছাত্র হিসেবে ভর্তি হওয়ার পর প্রফেসর মো: আবু তৈয়ব স্যারকে নিকট থেকে দেখার সুযোগ হয়।

স্যার আমাদেরকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয় পড়াতেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮৫-১৯৮৬ সেশনে লোকপ্রশাসন বিভাগের ১ম বর্ষের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হওয়ার পরও স্যারসহ কলেজের স্যারদের কথা মাঝে মধ্যে মনে হতো।

স্যারের সাথে দীর্ঘদিন আমার যোগাযোগ নেই। কিছুদিন আগে হঠাৎ করে স্যারের সাথে সিলেটের আম্বরখানায় দেখা ও কথা হয়। সুযোগ পেয়ে স্যারের মোবাইল নম্বর নিয়ে বলি, “সময় করে আপনার বাসায় আসবো”।

৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৭ তারিখ স্যারের সাথে দেখা হওয়ার একটু প্রেক্ষাপট বলতে হয়।সকালে জনাব আজির উদ্দিন চৌধুরীর(৮৯) মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নাইলাহি রাজিউন) তাঁকে দেখার জন্য বাসা থেকে বের হই। তিনি আমার ভাতিজি অর্চির নানা শ্বশুর। মহান আল্লাহ্ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করেন, আমীন।

তাঁকে দেখে ফিরে আসার সময় আমার সাথে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী গ্রন্থাগারিক জনাব কাওসার আহমদ ছিল। তার সাথে সরকারি কলেজে পড়াকালীন সময়ে আমার স্যারদের নিয়ে অনেক আলাপ হয়। তাকে বিদায় দিয়ে ভাবলাম আমার স্যারের অনেক বয়স হয়েছে। টেলিফোনে স্যারের সাথে কথা বলে কুমারপাড়াস্থ স্যারের বাসায় যাওয়ার জন্য রওয়ানা দিলাম। বাসার নিকটে যাওয়ার পর দেখি ভিতরে নেওয়ার জন্য স্যার বাসার সামনে দাড়িয়ে আছেন।

আমি একটু অবাক হয়ে বলি, স্যার আপনি কেন দাঁড়িয়ে আছেন? তিনি বলেন, “তুমি আমার ছাত্র, অনেক দিন পর দেখা, তুমি আমাকে দেখতে এসেছ, মনটা আমার খুশিতে ভরে গেছে তাই তোমাকে বাসার ভিতরে নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছি।” আমি দুঃখ প্রকাশ করে বলি স্যার আপনার কষ্ট হয়েছে, বাসাতো চিনি, এমনিতেই আসতে পারতাম। তিনি আমাকে বাসার ভিতরে নিয়ে বসালেন।

স্যারের সাথে অনেক কথা হলো। বাসার ছাদে নিয়ে তার সবজি বাগান ও ভিতরের একদিকে গরুর খামার দেখালেন। অনেক কষ্ট করে বাসা নির্মাণের গল্প করলেন। আমাদের স্যার সজ্জন, ধার্মিক ও আদর্শ মানুষ। তিনি শিক্ষকতা জীবনে সিলেট সরকারী কলেজ, এম.সি. কলেজ, মহিলা কলেজ, মৌলভীবাজার সরকারী কলেজ, হবিগঞ্জের বৃন্দাবন কলেজে চাকুরী করেছেন। বরিশাল বি.এম কলেজে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালনের কথাও জানালেন।

সিলেট সরকারি কলেজের ছাত্র অবস্থায় স্যারের সাথে আমার কিছু স্মৃতিকথা না বলে পারছিনা। আমি কিছুটা চঞ্চল ও দুষ্ট প্রকৃতির হওয়ায় ক্লাশে আমার খুব একটা মন বসতে চাইতনা। ক্লাশে সবাই মনযোগ সহকারে স্যারের কথা শুনতো। আমি একটু ব্যতিক্রম। মাথা ব্যাথা ও অন্য কোন অজুহাতের প্রসঙ্গ তোলে ক্লাশ থেকে বের হওয়ার সুয়োগ নিতাম।

স্যার বলতেন তোমার কি হলো, ও আচ্ছা বুঝেছি, “তুমি ক্যান্টিনে গিয়ে চা সিঙ্গারা খেয়ে আসো, সুযোগ পেলে মিছিলে যোগ দিয়েও আসিও। আমি ক্লাশে আছি। ক্লাশ শেষ হওয়ার ১০ মিনিট আগে আবার আসিও।” আমি ও আমার স্বভাব সুলভ কাজ শেষ করে ক্লাশে ফিরে আসতাম। কিন্তু ক্লাশে স্যারের প্রশ্নের ভাল উত্তর দিতে পারতাম। স্যারের সাথে কথা বলার এক পর্যায়ে স্যার বলেন, ‘তোমার কথা মনে পড়েছে, তুমি ছাত্র হিসেবে মেধাবী ছিলে।’ স্যারের কথা শুনে মনে হলো আমি দুষ্টামির ক্ষেত্রেও কম মেধাবী ছিলাম না।


প্রফেসর আবু তৈয়ব স্যার আমাদের সকলের নিকট আদর্শ শিক্ষক। তিনি ক্লাশে পড়ানোর সময় বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার শিক্ষাও হাতে কলমে বুঝিয়ে দিতেন। শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল মধুর। তিনি ১৯৯৬-১৯৯৮ পর্যন্ত সিলেট সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। স্যার অধ্যক্ষ থাকাকালীন সময়ের কথা বলতে গিয়ে বলেন, পরীক্ষায় নকলের বিরুদ্ধে কঠোরতার কারণে তখন ছাত্ররা সহজে নকল করার সুযোগ পেতোনা। ১৯৯৭ সনে ৫৫ জন, ১৯৯৮ সনে ৭৮ জন ছাত্রকে এইচ.এস.সির ফাইনাল পরীক্ষায় নকলের জন্য হল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এজন্য সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক জনাব আইয়ুব আনুষ্ঠানিকভাবে স্যারকে ধন্যবাদ জানান।

আমাদের প্রিয় স্যার সিলেট সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে ২৯ জুন ১৯৯৮ সনে অবসর নেন। স্যারের স্ত্রী মিসেস জাহানারা বেগম সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। স্যার আমাদেরকে যেভাবে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার চেষ্টা করতেন। পরিবারের ক্ষেত্রেও তিনি এর ব্যতিক্রম নন। তার একমাত্র ছেলে জনাব আহমদ হুমায়ুন কবির চৌধুরী সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে ইংরেজী বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পদে কর্মরত।

স্যারের সাথে কথা বলে  ফিরে আসার সময় স্যার বলেন, “মাঝে মধ্যে আমাকে দেখতে আসিও, আমার মৃত্যুর সংবাদ পেলে আমার জন্য দোয়া করিও।” এ কথা বলেই ৭৬ বছর বয়স্ক আমার স্যার কেঁদে ফেলেন। আমিও আবেগতাড়িত হয়ে স্যারকে জড়িয়ে ধরি এবং আমাদের জন্য দোয়া করতে বলি। স্যারের কথা শুনে মনে হলো আমাদের শিক্ষাগুরু স্যারদের সাথে মাঝে মধ্যে দেখা করা খুব প্রয়োজন।
লেখক: সৈয়দ সেলিম মো. আব্দুল কাদির, এডিশনাল রেজিস্ট্রার,শাবিপ্রবি,সিলেট।

আরও পড়ুন
এক্সক্লুসিভ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত