ঢাকা, ২১ জুলাই, ২০১৯
SylhetNews24.com
শিরোনাম:
ব্রেকিং নিউজ--বরগুনায় রিফাত হত্যা মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড র‍্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত

অভাবের যাতনা ও ক্ষোভে বীর মুক্তিযোদ্ধা জলফে আলীর আত্বহত্যা!

হাবিব সারোয়ার আজাদ,সুনামগঞ্জ

প্রকাশিত: ১৯ মার্চ ২০১৯  

অভাবের যাতনা ও প্রশাসনের সহযোগিতা না পাওয়ার ক্ষোভেই বয়োবৃদ্ধ বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জলফে আলী (৭৮) বিষপানে আত্বহত্যা করেছেন!  

গত রবিবার বিকালে সুনামগঞ্জ জেলা শহরে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের শৌচাগারে গিয়ে তিনি কীটনাশক (বিষ) পান করেন।পরে দরজা ভেঙ্গে তারঁ লাশ উদ্ধার করা হয়।

সোমবার ১৮ মার্চ বেলা সাড়ে ১১টায় এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে শেষবারেরমতো রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় নিজ গ্রামেই দাফন করা হয়।

জলফে আলী সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের গুদিগাঁও গ্রামের আমির আলীর ছেলে। তিনি ১৯৭১ সালে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ গ্রহন করে বীরত্বের স্বাক্ষর রাখেন।

প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী মরিয়ম বিবি রবিবার রাতে সদর মডেল থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা ডায়রী ভুক্ত করেছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে অভাবের কষ্ট এবং সরকারিভাবে বন্দোবস্তপ্রাপ্ত ভুমি উদ্ধারে  প্রশাসনের সহায়তা না পাওয়ার ক্ষোভে হতাশায় অবশেষে স্বাধীনতার মাসেই বয়োবৃদ্ধ  জলফে আলী আত্বহননের পথ বেচে নিয়েছেন।

 প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার পারিবারীক সুত্রে জানা যায়, রবিবার সকালে সিলেটে যাবার কথা বলে জলফে আলী সদর উপজেলার গুদিগাঁও’র নীজ বাড়ি থেকে বের হয়ে আসেন।

জেলা শহর সুনামগঞ্জ পৌছার পর ওই দিন সকাল ১০টায় জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯তম জন্মবার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবসে ৭১’র সহযোদ্ধা, সরকারি-বেসরকারি দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃদ্ধের সাথে জেলা শহরে শিশু সমাবেশ ও বর্ণাঢ্য আনন্দ র‌্যালীতে অংশ গ্রহন করেন।’

এরপর দুপুরের দিকে তিনি ফিরে যান মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে। মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের তৃতীয় তলায় শৌচাগারে গিয়ে ঘন্টা তিনেক পেরিয়ে গেলেও তিনি নীচে ফিরে না আসায় তার সন্ধানে তৃতীয় তলায় যান নৌশ প্রহরি আতিকুর রহমান সোহাগ।  শৌচাগারে সামনে গেলে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ পান। এরপর দরজা ভেতর থেকে কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে আশপাশের লোকজনকে ও ব্যবসায়ীদের ডেকে তিনি জড়ো করেন।

এক পর্যায়ে শৌচাগারের দরজা ফুটো করে দেখেন একজন মানুষের নিথর দেহ পড়ে আছে। পরবর্তীতে সদর মডেল থানা পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে শৌচাগারের ভেতর পড়ে থাকা বীরমুক্তিযোদ্ধা জলফে আলীর লাশ উদ্ধার করে। লাশের পাশেই পড়েছিল কীটনাশকে (বিষ)’র বোতল ।’

সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার এসআই প্রদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বিষপান করেই বীর এই মুক্তিযোদ্ধা আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন। সুরতহাল রিপোর্ট তৈরীর পর রবিবার রাতে লাশ মর্গে পাঠানোর পর ময়নাতদন্ত শেষে ওই রাতেই প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার লাশ পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়।’

এ ব্যাপারে তার স্ত্রী মরিয়ম বিবি সদর মডেল থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করেছেন। এতে তিনি তার স্বামীর মৃত্যুর কারন উল্লেখ করেছেন।

জানা গেছে, জলফে আলী একজন রাষ্ট্রীয় ভাতা প্রাপ্ত বীরমুক্তিযোদ্ধা। প্রথম স্ত্রী মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। প্রথম পক্ষের চার ছেলে মেয়ে ঢাকায় অবস্থায় করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছে।
 
এদিকে গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের গুদিগাঁও’ দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী কে নিয়ে বসবাস করতেন জলফে আলী। দ্বিতীয় পক্ষের দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। মেয়ের জামাইরাও দিনমজুরী করেন।’

সোমবার দাফন শেষে গুদিগাঁও নীজ বাড়িতে সদ্য প্রয়াত বীর মুত্তিযোদ্ধা জলফে আলীর বিধবা স্ত্রী মরিয়ম বিবি (৫৫) ও তার পরিবারের সদস্যদের সাথে এ প্রতিবেদের কথা হয়।আলাপকালে তারা জানান, ভুমিহীন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে জলফে আলী সদর উপজেলার নারায়ণতলা মৌজায় প্রায় দুই যুগ পুর্বে ৮০ শতাংশ ভুমি সরকারি ভাবে বন্দোবস্ত পান। কিন্তু ওই ভুমিতে নিজের দখলে টিনশেডের একটি ছোট বসতঘর ছাড়া অধিকাংশ ভুমি অন্যরা দখল করে ভোগ করছে।

ওই ভুমি নিজের দখলে পেতে গত প্রায় ৫/৬ বছর ধরে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, জেলা প্রশাসক সহ প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে আবেদন-নিবেদন করে, দিনের পর দিন ধর্ণা দিয়েও বন্দোবস্ত প্রাপ্ত ভুমি উদ্যারে প্রশাসনের তরফ থেকে কোন রকম সহযোগীতাই পাননি ওই বয়োবৃদ্ধ বীর মুক্তিযোদ্ধা।

এ কারনে তিনি স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভের পাশাপাশি  ক্রমশ হতাশায় ভুগছিলেন। এমন হতাশা থেকে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লে বয়োবৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা ফজলে আলী নানা রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। সংসারে অভাব অনটনও জেকে বসে।

মরিয়ম বিবি জানান, ভূমিটি পুরোপুরি উদ্ধার হলে জীবনের শেষ সময়ে ঢাকায় ও গ্রামে থাকা ছেলে মেয়েদের বসবাসের জায়গা করে দিয়ে যাবার জন্য তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন, কিন্তু ভুমি উদ্ধারে তিনি প্রশাসনের কোন সহযোগীতা না পেয়ে গত কয়েক মাস ধরেই বাড়িতে বলাবলি করতেন- 'জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করলাম,জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকল মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবার পরিজনকে নানা সুযোগ সুবিধা দেয়ার পাশাপাশী সম্মান ভালবাসাও দিয়েছেন কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনে কোন প্রয়োজনে গেলে আমাদের তেমন ভাবে কোন মুল্যায়ন করা হয়না'।

তিনি আরো জানান, মৃত্যুর কয়েক দিন পুর্বেও তিনি ভূমি উদ্ধারে সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট আরো একদফা মৌখিক ভাবে এমনকি লিখিত আবেদন করেছিলেন কিন্তু তাতেও সাড়া পাওয়া যায়নি, তাই হয়ত প্রশাসনের সহায়তা না পাওয়ার ক্ষোভে ও অভাবের তাড়না সইতে না পেরেই তিনি আত্বহত্যার পথ বেচে নিয়েছেন।

সোমবার সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইয়াসমিন নাহার রুমার নিকট এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বহু বছর পুর্বে মুক্তিযোদ্ধা জলফে আলী ৮০ শতাংশ ভুমি সরকারিভাবে বন্দোবস্ত পেয়েছেন বলে বিষয়টি আমি জানি। 'মৃত্যুর দিন কয়েক পুর্বে উনি আমার সাথে অফিসে এসে দেখা করে আমাকে মৌখিকভাবে ওই ভূমি অন্যদের দখলে থাকা ও ভূমিটি উদ্ধারের জন্য সরকারি সহায়তা চেয়েছেন কিন্তু লিখিত ভাবে কোন আবেদন তিনি করেননি'।
 

আরও পড়ুন
এক্সক্লুসিভ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত